লোকজনের সামনে কথা বলতে পারি না—কিন্তু কেন? সমস্যাটা কোথায়, সমাধানটা কী?

অনেকেই লোকজনের সামনে কথা বলতে গেলে অস্বস্তি বোধ করেন, গলা কাঁপতে থাকে, হার্টবিট বেড়ে যায়, আর মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ঘুরপাক খায় “ভুল বললে লোকে কী ভাববে?” অথচ এই ভয়টা খুব স্বাভাবিক এবং এর পেছনে থাকে কিছু মানসিক ও বাস্তব কারণ। সঠিকভাবে চিন্তা করলে আমরা দেখতে পাই, এই ভয় কাটানোর পেছনে রয়েছে কিছু ধাপে ধাপে সমাধান—যার মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, নিয়মিত প্র্যাকটিস, মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, এবং কিছু কার্যকর টেকনিক। এই আর্টিকেলে আমরা ঠিক সেসব বিষয় নিয়েই কথা বলবো—যা আপনাকে ধীরে ধীরে একজন কনফিডেন্ট স্পিকার হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।

তাহলে চলুন, সমস্যাটিকে স্টেপ বাই স্টেপ সমাধানের চেষ্টা করি…

সিনারিও-১ :

  • লোকজনের সামনে আমি কথা বলতে পারি না কেন? ➠ কারন আমি খুব ভয় পেয়ে যাই এবং নার্ভাস হয়ে যাই।
  • আমি এতটা ভয় পাই কেন? ➠ কারণ আমি মনে করি, আমি যদি কোন কিছু ভুল বলে ফেলি লোকে কি মনে করবে?
  • এমনটা আমি ভাবি কেন? ➠ কারণ আমি মনে করি, উক্ত ট্রপিকে আমার ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
  • এমনটা কেন মনে করি? ➠ কারণ উক্ত বিষয়ে আমার পর্যাপ্ত জানা-শোনা নেই ।তাই আমি পুরোপুরি কনফিডেন্স পাই না।

তার মানে, এখন থেকে আমি যে বিষয়ে কথা বলতে চাই ওই বিষয়ের উপর আগে থেকেই আমাকে যথেষ্ট পরিমাণ স্টাডি করে নিতে হবে। এতটা study করতে হবে যে, আমার যেন মনে না হয়, এই বিষয়ে আমার ভুল হতে পারে। কারণ যেই বিষয়ে আমি পর্যাপ্ত নলেজিবল,সে বিষয়ে কথা বলার সময় আমি কনফিডেন্ট থাকব এবং কোন প্রকার ভয় আমাকে গ্রাস করতে পারবে না। ফলে নার্ভাসনেসও আসবে না।

সিনারিও-২ :

  • এরপরেও আমি লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারি না। এর কারণটা কি? ➠ এ পর্যায়ে এসে আমাদের প্রচুর পরিমাণ প্র্যাকটিস করতে হবে।

অর্থাৎ আমি যেমন সিচুয়েশনে যে ট্রপিক নিয়ে কথা বলতে চাই, তেমন সিচুয়েশন বাসায় তৈরি করে, ওই ট্রপিক নিয়ে কথা বলার প্র্যাকটিস করতে হবে। এভাবে অনেকবার প্র্যাকটিস করলে, মূল প্রেজেন্টেশনের সময় নার্ভাসনেসটা খুব বড় আকার ধারণ করতে পারবে না।

সিনারিও-৩ :

  • পর্যাপ্ত স্টাডি করে নিলাম। সাথে প্র্যাকটিসও করে নিলাম। তবুও সেইম অবস্থা। কথা বলতে পারছিনা, ভয় কাজ করছে। কেন? ➠ কারণ এই পর্যায়ে আমার নার্ভাসনেস্টা আসতেছে মূলত, আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে। অর্থাৎ পূর্বে আমি এমন সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করতে ব্যর্থ হয়েছি।

আমাদের ব্রেনে অ্যামিগডালা(Amygdala) নামে একটা পার্ট আছে, যেখানে পূর্বের ব্যর্থতা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। যখনই আমি আবারো সেইম সিচুয়েশনে পড়ি,তখন ব্রেনের অ্যামিগডালা অংশটি দ্রুত একটিভ হয়ে যায়। ফলে আমাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়, হার্টবিট বেড়ে যায়, কন্ঠনালীতে কাঁপুনি আসে এবং নার্ভাসনেস বেড়ে যায়।

এখন আমাদের এমন কিছু করতে হবে যাতে ওই মোমেন্টে কোনভাবেই ব্রেনের অ্যামিগডালা অংশটি একটিভ না হয়।

এর জন্য ওই সময়ে আমার ফোকাসটা “আমার” থেকে উঠিয়ে “অডিয়েন্সের” দিকে নিতে হবে।

“You have to focus on your massage or audience, Not yourself”

উদাহরণস্বরূপ,

আমি কি বলবো!!
ভুল কথা বলে ফেললে আমার কি হবে!!
লোকে আমাকে নিয়ে কি ভাববে!!

এগুলো নিয়ে না ভেবে আমাকে ভাবতে হবে,

অডিয়েন্সরা আমার থেকে কি শুনতে চায়….
তাদের এই মুহূর্তে কোন জিনিসটা বেশি প্রয়োজন….
কি কথা বললে তারা প্রকৃতপক্ষে উপকৃত হবে….
তাদের সমস্যার প্রকৃত সমাধানটা আসলে কি….

এরকমভাবে চিন্তা করলে আমাদের ফোকাসটা আত্মকেন্দ্রিক ভয়ের দিকে নয়, বরং মূল পয়েন্টের দিকে থাকবে। ফলে তখন আর নার্ভাসনেস আসার কোন সুযোগই পাবে না।

কারন আমাদের ব্রেন এ্যাট এ টাইমে কেবলমাত্র একটি বিষয়ের উপরই পূর্ণ ফোকাস রাখতে পারে।

সিনারিও-৪ :

  • এতকিছুর পরেও লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। এখন কি করব? ➠ দেখুন, কথা বলার সময় যদি আমরা ভয় পেয়ে যাই অথবা নার্ভাস হয়ে যাই,তাহলে মূলত আমাদের হার্টবিট বেড়ে যায় এবং তখন আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস খুব দ্রুত চলতে থাকে।

এখন যদি আমরা টেকনিক্যালি কোনভাবে আমাদের হার্টবিটটাকে নরমাল অবস্থায় আনতে পারি এবং শ্বাস-প্রশ্বাস টাকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারি, তাহলেও কিন্তু আমাদের প্রবলেমটি সলভ হয়ে যাবে।

এটি করার জন্য আমাদের নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে হবে –

  • নিম্নস্বরে কথা বলতে হবে। জোর আওয়াজে কথাবাত্রা বলা যাবেনা।
  • ধীরগতিতে কথা বলতে হবে। দ্রুততার সাথে কথা বলা যাবে না।
  • কথা বলার সময় ধীরে ধীরে একটু লম্বা করে শ্বাস নিতে হবে এবং তা ছাড়তে হবে।

কথা বলার সময় এই বিষয়গুলো মেনে চলতে পারলে নার্ভাসনেসকে অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। সত্যি বলতে এই টেকনিকটা খুবই কার্যকরী। বিশ্বাস না হলে আপনি একবার ট্রাই করেই দেখুন না!

মাস্টার-সিনারিও :

  • সবকিছু মেনে চলার পরেও আপনি লোকজনের সামনে কথা বলতে পারছেন না। প্রবলেমটা যেন আপনার পিছুই ছাড়ছে না। কিন্তু কেন? ➠ আপনি আসলে সিচুয়েশনে পড়তে আগ্রহী নন। যখন আপনি কোন সিচুয়েশনে পড়তে মন থেকে আগ্রহী না হন, তখন আপনার ব্রেন সেটাকে বিপদজনক সিচুয়েশন হিসেবে ধরে নেয়, এবং আপনার ভিতরে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। আর তখনই আপনি নার্ভাস হয়ে যান।

এখন থেকে আপনাকে সিচুয়েশনের প্রতি আগ্রহী হতে হবে। যেহেতু আপনি লোকজনের সামনে কথা বলতে পারছেন না, তাই এই সমস্যাটি সমাধানের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে, আপনাকে বেশি বেশি লোকজনের সামনে কথা বলতে হবে, বক্তৃতা দিতে হবে, প্রেজেন্টেশন দিতে হবে। এমনকি এ কাজগুলো আপনাকে মন থেকে আগ্রহ নিয়ে করতে হবে, যাতে আপনি নিজেকে develop করতে পারেন।

আর যদি সত্যিই আপনি লোকজনের সঙ্গে কথা বলার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন, এবং সুযোগ পাওয়া মাত্রই সেটি লুফে নেন। তাহলে কখনোই কথা বলার সময় আপনার ভিতরে ভয় এবং নার্ভাসনেস আসতে পারবে না।

ফাইনাল স্টেপ :

এত কিছুর পরও যদি আপনি লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পান। তাহলে এর আর একটি সমাধানই বাকি। আর সেটি হল একটু নির্লজ্জ প্রকৃতির হওয়া অর্থাৎ আপনাকে আপনার শরীরের চামড়া গন্ডারের মতো মোটা বানাতে হবে।

অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, যে যাই বলুক না কেন, আপনার কিছু মনে করা যাবে না। আপনাকে কিছুটা এভাবে চিন্তা করতে হবে,
“আমি লোকজনের সামনে গিয়ে দাঁড়াবো, এরপর আমি যেটা বলতে চাই সেটা বলবো, যেভাবে আমি পারি সেভাবেই বলবো, অত সুন্দর করে গুছিয়ে বলার আমার কোন প্রয়োজন নেই, লোকজন আমার প্রশংসা করবে নাকি আমাকে নিয়ে টিটকারি করবে, এতে আমার কিছু যায়-আসে না। আমি জাস্ট আমার কথাগুলো বলে আমি চলে আসবো। ব্যাস।”

আমি হলফ করে বলতে পারি, যেইদিন থেকে আপনি এমন চিন্তা নিয়ে লোকজনের সামনে কথা বলতে যাবেন, সেদিন থেকে ভয় আপনার আশেপাশেও আসতে পারবে না।

মূল কথা :

✱ সবার প্রথমে আমাকে পর্যাপ্ত স্টাডি+প্র্যাকটিস করে নিতে হবে।

✱ তারপর আমাকে সিচুয়েশনের প্রতি আগ্রহী হতে হবে, কারন আমার ডেভলপ প্রয়োজন।

✱ “মানুষ কি মনে করবে” এই চিন্তা মাথা থেকে পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলতে হবে। কারণ উন্নতি বা অবনতির ভাগটা শুধুমাত্র আমার, মানুষের নয়!

✱ কথা বলার সময় ভয়/নার্ভাসনেসের দিকে ফোকাস না করে মূল পয়েন্টের দিকে ফোকাস রাখতে হবে। কারণ আপনার দুর্বলতা নিয়ে বেশি চিন্তা করলে নার্ভাসনেস কমবে না বরং আরো বাড়বে!

✱ কথা বলার সময় ধীরে ধীরে এবং নিম্নস্বরে কথা বলতে হবে এবং ধীরে ধীরে লম্বা করে নিশ্বাস নিতে হবে এবং ছাড়তে হবে।

লক্ষণীয় বিষয় :

➦ ভুলেও পারফর্ম করার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ প্রকাশ করা যাবে না! আপনি যত বেশি অনাগ্রহ দেখাবেন ভয় আপনাকে তত বেশি চেপে ধরবে। বরং লোকজনের সামনে কথা বলার কোন স্পেস পেলে এটাকে সুযোগ হিসেবে দেখুন, এবং সুযোগটাকে কাজে লাগান। কারণ আপনাকে যে ডেভলপ করতেই হবে!!!

➦ “লোকে কি মনে করবে?” এই মেন্টালিটি নিয়ে চললে আপনি কোনদিনও কোন কাজে সফল হতে পারবেন না। ভাই, আপনি কোন কিছুতে ভালো করলেও কিছু কিছু লোক আপনার সমালোচনা করবে। আবার খারাপ করলেও কিছু কিছু লোক সমালোচনা করবে। যখন সমালোচনা থেকে বাঁচার কোন ওয়ে নাই, তখন কেন আপনি এটা থেকে বাঁচতে চান? এটা একটা অসুস্থতা ছাড়া আর কিছু নয়। যে যা বলে, বলুক। তাদের সেটা বলতে দেন। কিন্তু আপনার কাজটা আপনি করে যান। দ্যাটস ইট।

9 thoughts on “লোকজনের সামনে কথা বলতে পারি না—কিন্তু কেন? সমস্যাটা কোথায়, সমাধানটা কী?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।