কেন মানুষ তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ বুঝেও করছে না?

আমরা অনেকেই জানি—কোন কাজগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা বুঝেও এই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এড়িয়ে চলি। কিন্তু কেন?
এটা শুধুই আলসেমি বা ইচ্ছাশক্তির অভাব নয়। এর পেছনে আছে মানসিক, বাস্তবিক এবং অভ্যসগত কিছু কারণ—যেগুলো আমাদের অজান্তেই কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

এই কনটেন্টে আমরা জানবো, ঠিক কোন সমস্যাগুলোর কারণে তুমি তোমার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ বুঝেও করছ না এবং প্রতিটি সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান, যা তুমি আজ থেকেই কাজে লাগাতে পারো।

এই সমস্যার কারণসমূহ :

১. উদ্দেশ্য স্পষ্ট না হওয়া (Lack of Clarity on “Why”)

যখন কাজের পেছনের উদ্দেশ্য (Purpose) পরিষ্কার থাকে না, তখন কাজটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা আবেগ-অনুভূতির স্তরে পৌঁছায় না। আর আবেগ না থাকলে কাজ শুরু করা হয় না। যখন আমরা কোনো কাজের গভীর উদ্দেশ্য জানি, তখন সেটার প্রতি আমাদের আবেগ তৈরি হয়। আবেগ থাকলে মস্তিষ্ক কাজটা “অর্জনযোগ্য ও অর্থবহ” মনে করে।

উদাহরণ: ধরো তুমি সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারছো না। কিন্তু যদি মনে করো, “আমি সকালে উঠব কারণ আমি আমার ক্যারিয়ার নিয়ে সিরিয়াস”—তাহলে এক ধরনের মানসিক দায় তৈরি হয়।

২. ভয় এবং সংশয় (Fear & Doubt)

উদ্দেশ্য থাকলেও যদি ভয় থেকে যায়—“আমি পারবো তো?”, “ব্যর্থ হলে?”, তাই মস্তিষ্ক নিজেকে সেফ রাখার জন্য কাজটা এড়িয়ে চলে। এই ভয় ও সংশয় কাজ শুরু করার প্রধান বাধা। মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি এড়াতে চায়, তাই এটি তোমাকে দরকারি কাজের পরিবর্তে সহজ কাজের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

উদাহরণ:
ধরো তুমি ইংরেজিতে কনটেন্ট লিখতে চাও, কিন্তু ভাবছো—“ভুল হলে সবাই হাসবে” বা “আমার লেখার মান ভালো না”—এই ভয়েই শুরু করছো না। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, যারা শুরু করে তারাই শেখে, এবং ভুল থেকেই উন্নতি হয়।

৩. পারফেকশনিজম (Perfectionism)

ভয়ের পর আসে পারফেকশনিজম— এটা আমাদের মনের ভেতরে অজান্তেই কাজের শুরুটা আটকে রাখে। শুরুর দিকেই আমরা কাজটা নিঁখুতভাবে করতে চাই। ফলে একটা সহজ বিষয়কে আমরা অনেক জটিল করে ফেলি। তখন আমরা ভাবি—“যেহেতু ভালোভাবে করতে পারছি না, তাহলে কাজটা করবই না”। অথচ ‘ভালো’ করার জন্য দরকার শুরু করা—যেটা আমরা করিই না।

উদাহরণ: ধরো তুমি ব্লগ লিখতে চাও, কিন্তু ভাবছো “ভালো করে না লিখলে কেউ পড়বে না”। এই চিন্তাই তোমার লেখার প্রথম লাইনটাই লিখতে দেয় না। কিন্তু যদি ভাবো—“শুরুর লেখাটা খারাপ হলেও শিখতে পারবো” অথবা “লিখতে লিখতেই উন্নতি হবে”—তবে সহজেই শুরু করা যাবে।

৪. অস্বস্তির প্রতি অস্বীকৃতি (Discomfort Avoidance)

পারফেকশনিজমের পরের বাধা হলো: নতুন কাজ শুরু করার সময় যে অস্বস্তি আসে, সেটা না মেনে নেওয়া।
আমরা চাই কাজটা সহজ হোক, আনন্দদায়ক হোক। কিন্তু উন্নতির শুরুটা বরাবরই একটু কঠিন।

উদাহরণ:
প্রথমবার সকালে ৬টায় ঘুম থেকে উঠতে গেলে শরীর কষ্ট পাবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা চাই, যেন কোনো কষ্ট ছাড়াই “মিরাকল মর্নিং” শুরু হয়ে যায়!

৫. বড় বা জটিল কাজ (Complicated Task)

মস্তিষ্ক স্বভাবতই বিশাল ও জটিল কাজকে ভয় পায়। কোনো কাজ যত বড় মনে হয়, ততই তাকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।যখন কাজটি বড় বা অগোছালো মনে হয়, তখন সেটা শুরু করতেই ভয় লাগে। ফলে আমরা নিজেকে বলি—“কাল করবো”, “আরেকটু পড়ে করবো” ইত্যাদি।

উদাহরণ: তুমি যদি ঠিক করো, “আমি প্রতিদিন ৩০ মিনিট ব্যায়াম করব”, তাহলে মস্তিষ্ক মনে করে এটা কঠিন। কিন্তু বলো, “আমি শুধু জুতা পরব, আর তারপর শুধুমাত্র ২ মিনিট হাঁটবো”—এভাবে শুরু করলে কাজটা সহজ মনে হয় এবং শুরু করা সম্ভব হয়।

৬. পরিকল্পনার অভাব (Lack of Clear Plan)

অনেক সময় উদ্দেশ্যও আছে, মোটিভেশনও আছে—তবুও কাজ হয় না, কারণ পরিকল্পনা নেই।
কখন করব, কীভাবে করব, কোন কাজটা আগে করব —এসব না থাকলে কাজ বাস্তবে রূপ নেয় না।

উদাহরণ:
তুমি ভাবছো “বিকেলে পড়ব”, কিন্তু কতটায়, কোন টপিক, কতক্ষণ—এগুলো না ঠিক করলে বিকেল তো কেটে যাবে, কিন্তু পড়া আর হবে না।

৭. বিলম্বিত পুরস্কার (Delayed Reward)

মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই তাৎক্ষণিক আনন্দ বা পুরস্কার (Instant Reward) পেতে চায়।  আর গুরুত্বপূর্ণ কাজের পুরস্কার আসে ধীরে ধীরে (Delayed Reward)। এই দুইয়ের মধ্যে একটি সংঘর্ষ তৈরি হয় — আর সেখানেই মানুষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ এড়িয়ে যায়।

উদাহরণ:
তুমি ঠিক করেছো, সন্ধ্যায় ১ ঘণ্টা ইংরেজি পড়বে। কিন্তু হঠাৎ ইউটিউবে একটা মজার ভিডিও রিকমেন্ড এলো —তখন মস্তিষ্ক বলে, “এটা দেখলেই এখনি মজা পাবে, পড়াশোনা তো পরে করলেও চলবে।”
ফলাফল, গুরুত্বপূর্ণ কাজ পিছিয়ে যায়।

সমাধান :

১. কাজের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করো
→ নিজেকে জিজ্ঞেস করো: “আমি কেন এটা করতে চাই?”, “এটা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?”
→ লিখে রাখো যাতে মনে থাকে।

২. ভয় ও সংশয় লিখে ফেলো এবং ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে যাও
→ ভয়কে অস্বীকার না করে মেনে নাও—“হ্যাঁ, ভয় পাচ্ছি, তাও করবো।”
→ ছোট কাজ দিয়ে শুরু করো।

৩. পারফেকশন বাদ দাও, অর্ধেক ভালো হলেও শুরু করো
→ কোনো এ্যাকশন না নেওয়ার চেয়ে Imperfect Action নেওয়া অনেক গুণে ভালো।
→ যতদিন না করা হয়, ততদিন ভালো করাও সম্ভব না।

৪. অস্বস্তিকে স্বাভাবিক মনে করো
→ Discomfort মানেই তুমি নতুন কিছু শিখছো, সঠিক পথে এগোচ্ছো।
→ নতুন অভ্যাস তৈরি করার জন্য শুরুতে “অসুবিধা মেনে নেয়ার” মানসিকতা গড়ে তোলো।

৫. কাজটাকে ভেঙে ছোট করে ফেলো
→ “ব্লগ লিখবো” নয়, বলো “আজ শুধু টপিক ঠিক করবো।”
→ এতে মানসিক বাধা কমে।

৬. পরিকল্পনা তৈরি করো এবং টাইম ব্লক করো
→ কি করবো, কতটুকু করবো, কতক্ষণ করব—এসব লিখে ফেলো।
→ পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে সেটা রিভিউ কর।

৭. বিলম্বিত পুরস্কারকে ইন্সট্যান্ট পুরস্কারে কনভার্ট করো।
→ কাজটিকে ছোট্ট ছোট্ট অংশে ভাগ করো
→ প্রতিটা অংশ কমপ্লিট করার পর নিজেকে ইন্সট্যান্ট পুরস্কিত করো।

শেষ কথা :

তুমি একা না, আমরা সবাই এই ফাঁদে পড়ি। কিন্তু এই ৭টি বাধা এবং সমাধান জানার পর এখন তুমি নিজেকে জিজ্ঞেস করতে পারো—
“আমি এখন কোন স্টেজে আটকে আছি? উদ্দেশ্যহীনতায়, নাকি বিলম্বিত পুরস্কারে?”
সেই অনুযায়ী সঠিক পথ নাও।

6 thoughts on “কেন মানুষ তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ বুঝেও করছে না?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।